Warning: in_array() expects parameter 2 to be array, string given in /home/mornings/public_html/e-pathshala.net/wp-content/themes/Theme/framework/plugins-support/woocommerce/woocommerce.php on line 21

Warning: in_array() expects parameter 2 to be array, string given in /home/mornings/public_html/e-pathshala.net/wp-content/themes/Theme/framework/plugins-support/woocommerce/woocommerce.php on line 24

Warning: in_array() expects parameter 2 to be array, string given in /home/mornings/public_html/e-pathshala.net/wp-content/themes/Theme/framework/plugins-support/woocommerce/woocommerce.php on line 27
‘বন্দী শিবির থেকে’ মুক্তিযুদ্ধের নিবিড় সূক্ষ্ম আর বিস্তৃত বর্ণনাতীত কাব্যগ্রন্থ - ই-পাঠশালা

‘বন্দী শিবির থেকে’ এর কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)  একজন সমকাল ও সমাজ সচেতন কবি। সমকালীন বাঙালির জাতীয় জীবনের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্ত মূর্ত হয়েছে তাঁর কবিতায়।  শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকার মাহুতটুলি নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি এবং একজন নাগরিক কবি ছিলেন। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মা আমেনা বেগম। পিতার বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরায় পাড়াতলী গ্রামে। শামসুর রাহমান’রা ভাই বোন ১৩ জন। তাদের মধ্যে কবি ৪র্থ। ১৯৪৫ সালে পুরোনো ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন এবং তিন বছর নিয়মিত ক্লাসও করেছিলেন সেখানে। শেষ পর্যন্ত আর মূল পরীক্ষা দেননি। পাসকোর্সে বিএ পাশ করে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এম এ (প্রিলিমিনারী) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।

কবি শামসুর রাহমান মধ্য পঞ্চাশের দশক থেকে কাব্যচর্চা শুরু করলেও ষাটের দশকে খুঁজে পেলেন নিজস্বতা।  শামসুর রাহমানের কবিতায় ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীর জীবন, একটি বিশেষ জনপথ, শহর, মানুষ ও স্বদেশ ইত্যাদি প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বারবার। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। ছিল না তাঁর হাতে রাইফেল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কবিতা লিখে বাঙালি জাতিকে সাহসী হওয়ার মন্ত্র দিয়েছিলেন। আরো দিয়েছেন শক্তি, স্বপ্ন ও সাহস। শামসুর রাহমানের উলেস্নখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০), রৌদ্রকরোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বসত্ম নীলিমা (১৯৬৭), নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮), নিজবাসভূমে (১৯৭০), বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২), দুঃসময়ের মুখোমুখি (১৯৭৩), ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা (১৯৭৪), এক ধরনের অহংকার (১৯৭৫), আমি অনাহারী (১৯৭৬), প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে (১৯৭৮), বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে (১৯৭৭), উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ (১৯৮২) ইত্যাদি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শামসুর রাহমান দেশের সাধারণ মানুষের জ্বালা, যন্ত্রণা, ক্ষোভ, ক্রোধ ও ঘৃণা প্রভৃতি নিজের করে নিয়েছিলেন এবং সেই চেতনার আলোকে তাঁর মুক্তিযুদ্ধের কবিতাগুলো রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্যে ‘বন্দি শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো খুবই আলোচিত, পরিচিত ও গুরুত্ববহন করে সকলের সামনে ধরা দিয়েছে। বিশেষ করে দুটি কবিতার মাধ্যমেই সকলের মুখে মুখে কবির নাম জপ উঠেছিল, এখনও বর্তমান।

‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতা একজন ব্যথিত কবির অভিজ্ঞতা ও ভাবনা বেদনার অভিজ্ঞান। শামসুর রাহমান এই কাব্যে যুদ্ধকে ছেঁকে তুলে আনতে চেষ্টা করেন তাঁর কবিতায়। এ কাব্যের শরীরে মাংসে রক্তে ধরা পড়েছে একাত্তরের বুলেটবিদ্ধ হৃৎপিণ্ডের ওঠানামা। বন্দিত্বের ব্যথা, ক্ষোভ ও হতাশা ইত্যাদি ব্যক্ত হয়েছে ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থের প্রায় সব কবিতায়। ‘বন্দি শিবির থেকে’ পাঠ করলে দেখা যায়, কবি কখনো ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন, আবার কখনো ভয়ে কাতর হয়ে আছেন।

সমাজবিজ্ঞানী জ্যা-জ্যাক রুশো বলেছেন, Man is born free, and everywhere he is in chains. মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম স্বাধীনভাবে বসবাস করা। কিন্তু স্বার্থবাদীরা সহজে কাউকে স্বাধীনতা দিতে চায় না। তারা নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কিন্তু মানুষ শৃঙ্খল মুক্ত হওয়ার জন্য সংগ্রাম করে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ শেষে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ ও দুই লক্ষ মা-বোনদের ইজ্জতের বিনিময় অর্জিত হয় স্বাধীনতা।

শামসুর রাহমানের ‘বন্দি শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, মানুষের অত্যাচার নির্যাতন, মুক্তির লড়ায়, দোসরদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর স্পৃহা যেভাবে ধরা দিয়েছে তাই তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতায় ‘স্বাধীনতা’ নামক শব্দটিকে কবি দেখেছেন বিভিন্নভাবে। ‘স্বাধীনত’ শব্দটিকে কবি ভরাট গলায় উচ্চারণ করে তৃপ্তি পেতে চান। শহরের অলিতে-গলিতে, আনাচে-কানাচে, প্রতিটি রাস্তায়, বাড়িতে, সাইনবোর্ডে, পাখিতে, নারীতে ঝলকিত হতে দেখেছেন প্রিয় শব্দটিকে। কবি বলেছেন, ‘অথচ জানে না ওরা কেউ/ গাছের পাতায়, ফুটপাতে/ পাখির পালকে, কিংবা নদীর দু’চোখে/ পথের ধুলায়, বসিত্মর দুরন্ত ছেলেটার/ হাতের মুঠোয়/ সর্বদাই দেখে জ্বলে স্বাধীনতা নামক শব্দটা।’

বাংলাদেশ প্রাচীন কাল থেকে ধন-সম্পদ, মণি-মানিক্যে ভরা। তাই বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে এদেশে আসত। দেশে সুখ-শান্তি ছিল। শ্যামল প্রকৃতি ছিল। শান্তি প্রিয় বাঙালি সহজ সরল জীবন-যাপন করতো। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালো রাত্রি পাকিস্তানী বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালির উপর। শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ। তারপর যুদ্ধ শুরু হয় স্বাধীন একটি দেশ পাওয়ার জন্য। ‘প্রতিটি অক্ষরে’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘আমার মগজে ছিল একটি বাগান, দৃশ্যাবলিময়।/কখনো তরুণ রৌদ্রে কখনো বা ষোড়শীর যৌবনের মতো/…………………./এখন আমার কবিতার/প্রতিটি অক্ষরে বনবাদড়ের গন্ধ, গেরিলার নিঃশ্বাস এবং/চরাচরব্যাপী পতাকার আন্দোলন।’

শামসুর রাহমানের বহুল প্রচারিত দুটো কবিতা হচ্ছে ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ এবং ‘স্বাধীনতা তুমি’। কবিতাদ্বয় যুগল কবিতা নামে পরিচিত। এ দুটো কবিতাও ‘বন্দি শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা। এই কবিতায় শামসুর রাহমান স্বাধীনতাকামী এমন কিছু মানুষের কথা বলেছেন যারা একেবারে খেটে-খাওয়া মানুষ, দরিদ্র সাধারণ মানুষ। কবি বলেছেন, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা/ তোমাকে পাওয়ার জন্যে/ আর কতোকাল ভাসতে হবে রক্ত গঙ্গায়/ আর কতোবার দেখতে হবে খাণ্ডব দাহন?/ তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা/ সখিনা বিবির কপাল ভাঙলো/ সিথির সিঁদুর মুছে গেলো হরিদাসীর।’

একই কবিতায় কবি দৃঢ়তার সাথে জোরগলায় আশার বাণী শুনিয়েছেন, ‘পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত/ ঘোষণার ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে/ নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিকবিদিক/ এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে/ হে স্বাধীনতা।’

দেশ-মাতার দুর্দিনে কোনো খাঁটি দেশ প্রেমিক স্থির থাকে না। অবস্থা উত্তরণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। কোনো দেশ প্রেমিকের সামনে দেশের ক্ষতি হলে তাঁরা প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি জীবনও দিতে হয় তাতেও তারা প্রস্তুত। আর যারা দেশের জন্য প্রাণ দেয় তারা শহীদ। শহীদেরা কখনো মরে না। শহীদদের কপালে থাকে যৌবনের রাজটিকা। যতদিন দেশ তথা পৃথিবীর আলোবাতাস আছে ততোদিন তারা বেঁচে আছেন। এ বিষয়ে ‘ললাটে নক্ষত্র ছিল যার’ কবিতায় বলেছেন, ‘গুলির ধমকে হাত ভূলণ্ঠিত পতাকা যেন বা,/জানু-দেহচ্যুত নিমেষেই, ঝাঁঝরা বুক।/মাটিতে গড়ায় ছিন্ন মাথা/মুকুটের মতো,/অথচ ললাট থেকে কিছুতেই নক্ষত্র খসে না।’

‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় স্বাধীনতা নামক শব্দটিকে কবি সাজিয়েছেন নানা বর্ণে-রূপে-সুরে এবং তিনি তা সংগ্রহ করেছেন বাংলার নৈসর্গিক জীবনাচার থেকে। স্বাধীনতাকে নজরুলের বাবরি চুল, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, শহীদ মিনার, পতাকা মিছিল, ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি, গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার ইত্যাদির সঙ্গে তুলনা করেছেন। কবিতায় কবি বলেছেন, ‘স্বাধীনতা তুমি/রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।/ স্বাধীনতা তুমি/ কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো/ মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা/…………..স্বাধীনতা তুমি/ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।/স্বাধীনতা তুমি/ রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার। ’

‘পথের কুকুর’ কবিতায় কবি একাত্তরের অবরুদ্ধ জীবনের কথা বলেছেন, যেখানে ভয়ে কাতর থাকত পুরুষ-নারী, ছেলে-মেয়ে-বুড়ো সবাই। এই কবিতায় কুকুরের অসীম সাহসের কথা বলেছেন। জলপাই রং, সন্ত্রাস, সশস্ত্র কতিপয় সৈনিক বোঝাই একটি জিপকে বারবার তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে পথের কুকুর। কিন্তু অসহায় মানুষের সশস্ত্র সেই জিপ তাড়াবার সাহস নেই। তাই কবিতায় কবি ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ‘যদি অন্তত হতাম আমি পথের কুকুর’। ‘পথের কুকুর’  নামক কবিতায় কবি বলেছেন, ‘আমি বন্দি নিজ ঘরে। শুধু/ নিজের, নিঃশ্বাস শুনি, এত স্তব্ধ ঘর।/ কবুরে স্তব্ধতা নিয়ে বসে আছি/ দেয়াল-বিহারী টিকটিকি – / চকিতে উঠলে ডেকে, তাকেও থামিয়ে দিতে চাই।’

‘দখলি স্বত্ব’ কবিতার বোধ গভীর ও ভয়াবহ। যুদ্ধের কারণে ফেলে আসা বাড়িতে আবার ফেরার কথা মনে উঠতেই কবির মনে হয়েছে, ‘অথচ আমার/ বাড়ির দখলি স্বত্ব হারিয়ে ফেলেছি।/ সব কটি ঘর জুড়ে বসে আছে দেখি/ বিষম অচেনা এক লোক-/ পরনে পোশাক খাকি, হাতে কারবাইন।’

যুদ্ধকালীন প্রতিদিনের বাসত্মবচিত্র ধরা পড়েছে ‘প্রাত্যহিক’ কবিতায়। পুলিশ এবং রাজাকারের দৌরাত্ম্য, নারীর চিৎকার, হাত বাঁধা মানুষ, রাইফেলধারী পাঞ্জাবি সৈনিক ইত্যাদির বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে এ কবিতায়। চারিদিক পালাবার সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছে হানাদার বাহিনী। সেই কথাই  কবিতায় কবি বলেছেন, ‘পশ্চিমা জোয়ান আসে তেড়ে/ স্টেনগান হাতে আর প্রশ্ন দেয় ছুঁড়ে ঘাড় ধরে/ ‘বাঙালী হো তুম?’

ত্রিশ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার শিকার হয়েছিল। বন্দী শিবির থেকে অকথিত, অনুল্লেখিত এসব হত্যার এক অসাধারণ দলিল হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিটি কবিতার পরতে পরতে আছে এসব হত্যার শ্বাসরোধী বর্ণনা। ‘না, আমি যাবো না’ কবিতায় কবি বলেছেন, ‘আমিও নিজেকে ভালোবাসি/ আর দশজনের মতন। ঘাতকের/ অস্ত্রের আঘাত/ এড়িয়ে থাকতে চাই আমিও সর্বদা।/ অথচ এখানে রাস্তাঘাটে/ সবাইকে মনে হয় প্রচ্ছন্ন ঘাতক।/ মনে হয়, যে কোনো নিশ্চুপ পথচারী/ জামার তলায়/ লুকিয়ে রেখেছে ছোরা, অথবা রিভলবার, যেন/ চোরাগোপ্তা খুনে/ পাকিয়েছে হাত সকলেই।’

ধ্বংস, রক্তের সাগর পেরিয়ে স্বাধীনতা আসলেও তা শান্তির, সুখের, মুক্তির। অর্জিত স্বাধীনতা নতুন প্রাণের সৃষ্টি করে। এনে দেয় স্বর্গীয় সুখ। তাই স্বাধীনতা আমাদের চির কাম্য। কবি শামসুর রাহমান ‘যে- পথে আমার পদধ্বনি’ কবিতায় স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ রূপ অঙ্কন করে বলেছেন,  ‘যখনই প্রবল আমি আসি,/আমার দু-চোখ জ্বল জ্বল/ধ্বংস আর সৃষ্টি/কাঁপে পাশাপাশি; আমি স্বাধীনতা।’

প্রথমদিকে পাকিস্তানি বাহিনী এদেশের পথঘাট কিছুই চিনত-জানত না। কিন্তু পরবর্তীকালে আমাদের দেশীয় স্বার্থপর ও লোভী দালালদের সঙ্গে হাত করে গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর এরা ধ্বংস ও লুটপাট করতে লাগল। একদিকে পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনী, অন্যদিকে এদেশীয় আলবদর-রাজাকার বাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন আর ধর্ষণের ফলে নিরীহ বাঙালির জাতীয় জীবন হয়ে উঠল অতিষ্ঠ। তখন বাঙালি বুঝলো যুদ্ধ ছাড়া মুক্তি নাই। আর সেই মুক্তি বা যুদ্ধের কথাই বলেছেন ‘উদ্ধার’ কবিতায়। বলেছেন, ‘বিষম দখলীকৃত এ শহর/ পুত্রহীন বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞেস করুন/ যন্ত্রণা জর্জর ঐ বাণীহীন বিমর্ষ কবিকে/……….জননীকে হারিয়ে সম্প্রতি খাপছাড়া/ ঘোরে ইতস্ত তাকে জিজ্ঞেস করুন/ হায় শান্তিপ্রিয় ভদ্রজন,/ এখন বলবে তারা সমস্বরে। যুদ্ধই উদ্ধার।’

‘কাক’  কবিতাটি আকারে কাকের মতো ছোট হলেও এর মধ্যে বিধৃত হয়েছে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের বাস্তব সমাজ আলেখ্য। মাঠে কোনো গরু নেই, রাখাল ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। শূন্য মাঠ, নির্বাক বৃক্ষ, নগ্ন রৌদ্র, স্পন্দমান কাক – এগুলো হাহাকার ও শূন্যতার প্রতীক। সেই শূণ্যতাই ধরা পড়েছে কবিতায় এভাবে, ‘গ্রাম্য পথে পদচিহ্ন নেই। মাঠে গরু/ নেই কোনো, রাখাল উধাও, ……………………/ নগ্ন রৌদ্র চতুর্দিকে, স্পন্দমান কাক, শুধু কাক।’

বাঙালি স্বাধীনভাবে সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত। কিন্তু সে পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তানী হানাদারেরা। কিন্তু বাংলার দামাল ছেলেরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য। তারা পুনরুদ্ধার করতে চায় ষোড়শীরা কলস নিয়ে পুকুর ঘাটে পানি আনতে নির্বাধে যাওয়া; ছোট ভাই আনন্দে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করতে পারে। বৃদ্ধ বাবা যেন গুড়গুড় শব্দ করে হুঁকো টানতে পারে। সে জন্য বাঙলার দামাল ছেলেরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছে, যুদ্ধ করেছে। এই প্রসঙ্গে গ্রামীণ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘যাকে ভালোবাসি সে যেন পুকুর ঘাটে ঘড়া রোজ/নিঃশঙ্ক ভাসাতে পারে, যেন এই দুরন্ত ফিরোজ,/আমার সোদর, যেতে পারে হাটে হাওয়ায় হাওয়ায়,/বাজান টানতে পারে হুঁকো খুব নিশ্চিন্তে দাওয়ায়,/তাই মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও এই এঁদো-গ-গ্রামে/ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম কী দুর্বার সশস্ত্র সংগ্রামে।’

কাব্যগ্রন্থের স্মৃতিচারণমূলক একটি কবিতা ‘মধুস্মৃতি’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রেস্তোরার নাম মধুর ক্যান্টিন। যার নাম অনুসারে এই রেস্তোরার নামকরণ করা হয়েছে, তিনি হলেন ‘শ্রী মধুসূদন দে’। মধুদা বলে তিনি সকলের কাছে অতিপরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সকলের প্রিয় মানুষ। এই মধুর ক্যান্টিন ছিল আমাদের সকল জাতীয় আন্দোলনের সূতিকাগার। একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে মধুদাকে ঘাতকরা নির্মমভাবে হত্যা করে। তাই মধুদার স্মৃতিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে শামসুর রাহমান লিখলেন অমর কবিতা ‘মধুস্মৃতি’ কবিতাটি। কবি বলেছেন, ‘আপনার নীল লুঙ্গি মিশেছে আকাশে,/ মেঘে ভাসমান কাউন্টার। বেলা যায়, বেলা যায়/……………………… /হায়। আমরাতো বন্দী আজো – মেঘের কুসুম থেকে/ জেগে ওঠে, ক্যাশবাক্স রঙিন বেলুন হয়ে উড়ে।’

অবরুদ্ধতা, ক্ষোভ আর মর্মে-হত্যার এমন নিচু স্বরের অথচ গগনবিদারী শিল্পীত রূপায়ণ কথাসাহিত্য আর কাব্যসাহিত্য উভয় শাখাতেই বিরল। ‘বন্দী শিবির থেকে’তে কবি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ধ্বংস, দ্রোহ, অসহায়তা, আত্মপ্রত্যয়, বিশ্বাসঘাতকতা, উদ্বাস্তুতা, অন্তর্ঘাত, স্বপ্ন, সার্থকতা, নিঃস্বতার এমন নিবিড় সূক্ষ্ম আর বিস্তৃত বর্ণনা হাজির করেছেন যে অনেক সময় মনে হয় এটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতার ঘাটতি পূরণ করে উপন্যাসের দৈন্য ঘোচানোর দিকে পা বাড়িয়েছে। কারণ বাস্তবের বিস্তৃত, খুঁটিনাটি বর্ণনাই তো উপন্যাস।

 


ই-পাঠশালা’র একাডেমিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণধর্মী ক্লাস, ব্লগগুলো ভালো লাগলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না। এবং আরও ক্লাস পেতে চোখ রাখুন আমাদের ফেসবুক পেজ : ই-পাঠশালা । e-pathshala এবং ইউটিউব চ্যানেল : e-pathshala

ই-পাঠশালা’র ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার/আপনার লেখাটি ই-মেইল করতে পারো/পারেন এই ঠিকানায়:  Support@E-Pathshala.Net 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Fill out this field
Fill out this field
Please enter a valid email address.
You need to agree with the terms to proceed

Menu