Warning: in_array() expects parameter 2 to be array, string given in /home/mornings/public_html/e-pathshala.net/wp-content/themes/Theme/framework/plugins-support/woocommerce/woocommerce.php on line 21

Warning: in_array() expects parameter 2 to be array, string given in /home/mornings/public_html/e-pathshala.net/wp-content/themes/Theme/framework/plugins-support/woocommerce/woocommerce.php on line 24

Warning: in_array() expects parameter 2 to be array, string given in /home/mornings/public_html/e-pathshala.net/wp-content/themes/Theme/framework/plugins-support/woocommerce/woocommerce.php on line 27
‘চাঁদের অমাবস্যা’ : একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের আখ্যান - ই-পাঠশালা

‘চাঁদের অমাবস্যা’র সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ 

কথানির্মাতা, নাট্যকার ও চিত্রশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৫ আগস্ট ১৯২২ – ১০ অক্টোবর ১৯৭১) ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রজ্ঞা আর সমাজনিবিড় জীবন-অভিজ্ঞানের প্রতিফলনের ভেতর দিয়ে বাংলাসাহিত্যে নিজের একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন।

বাংলা সাহিত্যে কবিগুরুকে যদি বলা হয় ছোট গল্পের রাজা, তাহলে ছোট গল্পের রাজপুত্র হচ্ছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। তবে তিনি রবীন্দ্রবলয়ের বাইরে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক আধুনিক গল্পকার। তিনি উচ্চবিত্ত পরিবারের একজন হয়েও সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কথাকেই তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য করেছেন। তিনি ছোট গল্প লেখা দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে পথচলা শুরু করলেও পরে একজন সফল ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার হিসেবেও নিজেকে উপস্থাপন করেন। ছোট গল্প ও উপন্যাস রচনায় আলাদা একটি ধারা সৃষ্টি করেছিলেন তিনি, যা পরে অনেক লেখকের কাছে ছিল অনুসরণীয়।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লেখন শৈলী, দৃশ্য বিন্যাস ও গল্প নির্মাণের ধরন পাঠকদের সহজেই আকৃষ্ট করে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে এ কারণেই একজন ভাষা শিল্পীও বলা যায়। তাঁর লেখায় উঠে আসে সমাজের অসংগতি, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সব অসংগতির বিরুদ্ধে স্পষ্টবাদী প্রতিবাদী লেখক ছিলেন। তিনি একজন সমাজসংস্কারক ও দার্শনিকও বটে। সাধারণ মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে সমাজের অসংগতিগুলো যেমন দেখিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি সমস্যা সমাধানের দিশাও দিয়েছেন তিনি। ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনি’ ও ‘লালসালু’-এর লেখক বলতেই সবাই তাঁকে চিনে নেয়। একাডেমিক পড়াশোনার খাতিরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ঝেড়ে মুখস্থ করতে হয় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যকর্মের পরিচিতি। ‘চাঁদের অমাবস্যা’ ও ‘কাঁদো নদী কাঁদো’-এর মতো উপন্যাস এবং ‘বহিপীর’, ‘তরঙ্গভঙ্গ’, ‘সুড়ঙ্গ’-এর মতো নাটকগুলোর লেখক হিসেবেই তাঁকে আমরা চিনি।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জন্ম ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের ষোলোশহর। তাঁর মা নাসিম আরা খাতুন ছিলেন চট্টগ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারের সন্তান; আর বাবা সৈয়দ আহমদউল্লাহ ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। ওয়ালীউল্লাহর বাবা ছিলেন নোয়াখালীর অধিবাসী। তবে তাঁর সরকারি চাকরির সুবাদে ময়মনসিংহ, ফেনী, ঢাকা, হুগলি, চূঁচুরা, কৃষ্ণনগর, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ প্রভৃতি জায়গায় ওয়ালীউল্লাহর শৈশব ও শিক্ষাজীবন কেটেছে। ১৯৩৯ সালে কুড়িগ্রাম হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। কলেজের প্রথম বর্ষে থাকতেই ঢাকা কলেজ ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম গল্প ‘সীমাহীন এক নিমেষে’ প্রকাশিত হয়। ১৯৪১ সালে তিনি প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন। এরপর ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯৪৩ সালে ওয়ালীউল্লাহ ডিসটিঙ্কশনসহ বিএ পাস করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁর ও তাঁর বড় ভাইয়ের ওপর এসে পড়ে।

চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর মামা খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলামের সহায়তায় ‘কমরেড পাবলিশার্স’ নামে একটি প্রকাশনী সংস্থা খোলেন। ১৯৪৫ সালে ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’ পত্রিকার সাব-এডিটর হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫১ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ওয়ালীউল্লাহ দিল্লি, সিডনি, জাকার্তা ও লন্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসের প্রেস উইংয়ে কাজ করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি প্যারিসে পাকিস্তান দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলেন এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল অবধি তিনি ইউনেসকোর প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালে দিল্লি থেকে তিনি বদলি হন অস্ট্রেলিয়াতে। সেখানে তাঁর জীবনে আবির্ভাব ঘটে ফরাসি কন্যা অ্যান মেরির। অ্যান মেরি তাঁর দূর প্রবাসের নিঃসঙ্গতার অনেকটাই দখল করে নেন। ১৯৫৪-তে ওয়ালীউল্লাহ ঢাকায় বদলি হয়ে আসার পর অ্যানের বিরহে কাতর হয়ে পড়েন। দুজন অনবরত পরস্পরের কাছে চিঠি লিখেছেন সে দিনগুলোতে। ১৯৫৫ সালে অ্যানকে বিয়ে করেন ওয়ালীউল্লাহ। তাঁর স্ত্রী পরে তাঁর ‘লালসালু’ উপন্যাস ফরাসি ভাষাতে অনুবাদ করেন। এটি পরে ইংরেজিতে ‘Tree Without Roots’ নামেও অনূদিত হয়।

তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য তাঁকে পিইএন পুরস্কার (১৯৫৫), উপন্যাসে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬১), আদমজী পুরস্কার (১৯৬৫), একুশে পদক (১৯৮৩, মরণোত্তর) প্রভৃতি সম্মাননা প্রদান করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ দেখার আগেই এক বুক হতাশা নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে নিজ বাসভবনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

‘চাঁদের অমাবস্যা’ একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের আখ্যান –

মানুষের সামাজিক খ্যাতি, আর্থিক নির্ভরতা ও লোভ, নগরের বিকাশ এবং ফলত গ্রামীণ জীবনধারার ক্রম-বিলোপ, রাষ্ট্রীয় অভ্যন্তরীণ ও বহির্নীতি, ভিন্ন সংস্কৃতির আলোয় ব্যক্তির চিন্তা প্রকাশের কৌশল ও বাস্তবতা প্রভৃতিকে তিনি সাহিত্যকর্মের ফ্রেমে আঁকতে চেষ্টা করেছেন। লেখার পাশাপাশি তিনি চিত্রকর্মের যে চর্চা করতেন, সেখানেও ছিল ওই একই দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর তিনটি বহুল আলোচিত উপন্যাস লালসালু (১৯৪৮), চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪), কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮)। চারটি নাটক আর বাইশটি গল্পের বাইরে, তাঁর মৃত্যুর পর, আরো দুটি উপন্যাস সাহিত্যপ্রেমীরা পায়, সে গ্রন্থগুলো ইংরেজিতে লেখা, নাম যথাক্রমে ‘দ্য আগলি এশিয়ান’ ও ‘হাউ ডাজ ওয়ান কুক বীনস্’; অত্র গ্রন্থগুলোর বাংলা অনুবাদ ‘কদর্য এশীয়’ ও ‘শিম কীভাবে রান্না করতে হয়’। আমাদের আজকের প্রসঙ্গ ‘চাঁদের অমাবস্যা’।

১৯৬৪ সালে নওরোজ কিতাবিস্তান থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় চাঁদের অমাবস্যা উপন্যাসটি। ফ্রান্সে থাকাকালীন সময়ে তিনি বইটি লিখেন এবং এর প্রচ্ছদ তিনি নিজেই করেছিলেন।

 

‘চাঁদের অমাবস্যা’র মূল কাহিনীটা সংক্ষেপে বললে এরকম দাঁড়ায়-

‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসের নায়ক একজন স্কুলশিক্ষক৷ নাম আরেফ আলী৷ ঔপন্যাসিক তাকে যুবক শিক্ষক বলে বারবার অভিহিত করেছেন৷ যুবক শিক্ষক অতিশয় দরিদ্র৷ চাঁদপারা গ্রামে তার বাড়ি৷ হাতের তালুর মতো একটু জায়গা-জমি আছে তাদের৷ বিধবা মা সংসারে৷ আর কেউ নেই৷ শাক-সবজির জমিটুকু বিক্রি করে উচ্চশিক্ষার অভিলাষ পূরণ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি৷ তাই সদ্য প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুলে সে চাকরি নিয়েছে৷ স্কুলটি গ্রামে৷ এ গ্রামের জোতদার বড় দরবেশ সাহেব স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন৷ এ গ্রামের বড় বাড়িতেই লজিং মাস্টার হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে যুবক শিক্ষক। যুবক শিক্ষকের কোনো খরচ নেই, কেননা আশ্রয়দাতাদের বাড়িতে খায়, থাকে৷ বেতন যা পায়, তা পাঠিয়ে দেয় বিধবা মাকে৷ এক গভীর পূর্ণিমা রাতে যুবক মাস্টার বড় বাড়ি সংলগ্ন জঙ্গলের মতো ঘরের পেছনে এক ঝোঁপের পাশে একটি জাম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে৷ সে বাইরে এসেছিল প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য৷ হঠাৎ দেখতে পায় বড় বাড়ির দাদা সাহেবের ছোট ভাই কাদের দরবেশ হেঁটে যাচ্ছে একা একা ভরা জোছনার ভেতর দিয়ে৷ যুবক মাস্টার কৌতূহলী হয়ে ওঠে৷ সে কাদেরকে অনুসরণ করতে থাকে৷ দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয় যুবক মাস্টারকে৷ রাতের জোছনা ভরা, রূপালি চাঁদের ঢেউ খেলানো প্রকৃতি, চষা ক্ষেত, গৃহস্থের বসতবাড়ি, ভিটেবাড়ি পেরিয়ে কাদের দরবেশ নদীর পাড়ে এক গভীর বাঁশবনের ভেতর চলে যায়৷ এর মধ্যে যুবক মাস্টার কাদেরের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে তাকে হারিয়ে ফেলে৷ একটা অনতিদীর্ঘ সময় পর সেও হাজির হয় ওই বাঁশবনে৷ দেখতে পায় এক বীভত্স দৃশ্য। ‘চাদের অমাবস্যা’র ভাষায়, শীতের উজ্জ্বল জ্যোৎস্না রাত, তখনো কুয়াশা নামে নাই৷ বাঁশঝাড়ে তাই অন্ধকারটা তেমন জমজমাট নয়৷ সেখানে আলো-অন্ধকারের মধ্যে যুবক শিক্ষক একটি যুবতী নারীর অর্ধ উলঙ্গ মৃতদেহ দেখতে পায়৷ … পায়ের ওপর একঝলক চাঁদের আলো৷’

এই পাশবিক দৃশ্য দেখে তার মতো যুবক শিক্ষকের তাবৎ অস্তিত্বের মধ্যে প্রলয় শুরু হয়ে যায়৷ সে হতভম্ভ, বিভ্রান্ত, বিমূঢ় ও বিপন্ন দশায় উপনীত হয়৷ তার অস্তিত্বের মধ্যে মারাত্মক সংকট দেখা দেয়৷ সে একটা মরণাপন্ন মুমূর্ষু দশায় উপনীত হয়৷ তার শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে৷ সে চষা ক্ষেত বরাবর রুদ্ধশ্বাসে দৌঁড়াতে থাকে৷ এক পর্যায়ে সে ক্ষেতের আইলের পাশে উবু হয়ে পড়ে থাকে৷ তার ভেতর থেকে চিরতরে প্রশান্তি শিশিরের মতো উবে যায়৷ কত কষ্টে পড়ালেখা শিখেছিল, স্কুলে চাকরি পেয়ে তার দারিদ্র্য বিমোচন ঘটেছিল, আশ্রয় পেয়েছিল এই বড় বাড়িতে৷ এরা জোতদার-ভূস্বামী, এরাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা৷ বেতন পেলে বিধবা মাকে পাঠিয়ে দিত৷ অথচ এ বাড়িরই প্রভাবশালী ব্যক্তি কাদের দরবেশ এই পাশবিক ব্যভিচারের সঙ্গে জড়িত৷ যুবক শিক্ষকের মতো গ্রাম্য-দরিদ্র-নিরীহ মানুষ এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়নি৷ উপন্যাসে বলা হচ্ছে, সাপের মুখগহ্বরে ঢুকে ব্যাঙের আওয়াজ যেন হঠাৎ থামে বা মস্তক দেহচ্যুত হলে মুখের আওয়াজ যেন অকস্মাৎ স্তব্ধ হয়৷ দেহচ্যুত মাথা এখনো হয়তো আর্তনাদ করছে, কিন্তু তাতে আর শব্দ নাই৷’

সাপের গ্রাসের সামনে ব্যাঙ যেমন অসহায়, তেমনি ব্যাঙের মতো অসহায়-দরিদ্র, গ্রামের এক মাঝির বন্ধ্যা যুবতী স্ত্রীকে বাঁশঝাড়ে ডেকে এনে কাদের দরবেশ বলাৎকার করে৷ কৌতূহলবশত যুবক শিক্ষক ওখানে উপস্থিত হলে শুকনো বাঁশ পাতার মচমচ শব্দ শুনে বন্ধ্যা বউটি ভয়ে দাপাদাপি করেছিল, হয়তো চিৎকার দিতে চেয়েছিল, হয়তো নিজেকে কাদেরের লোমশ হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিল৷ তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করার জন্য কাদের শায়িত নারীর গলদেশ চেপে ধরেছিল, তাতে তার মৃত্যু ঘটে৷ অর্ধ বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে থাকে৷ কাদের বাঁশঝাড় থেকে দ্রুত বের হয়ে যায়৷ এখানে কাদের যে বন্ধ্যা বউটিকে ভোগ করার জন্য ডেকে এনেছিল, হয়তো সে স্বেচ্ছায়ই এসেছিল৷ গরিব, এত বড় প্রভাবশালী বড় বাড়ির মানুষের আহ্বান উপেক্ষা করতে পারেনি৷ মানুষের পদশব্দ শ্রবণ করে বিচলিত হয় কাদের৷ কেউ জেনে ফেললে বড় বাড়ির ইজ্জত যাবে৷ তাই বউটির গলা চেপে ধরেছিল, যাতে শব্দ না করে৷ যাতে কেউ না জানে৷ জীবনের চেয়ে ঠুনকো ইজ্জত এখানে বড় হয়ে দেখা দেয় বিবেক, মনুষ্যত্ব লাঞ্ছিত হয়৷ এরই নিদারুণ প্রতিক্রিয়া হয় যুবক শিক্ষকের বিবেকের মধ্যে৷ সবচেয়ে মর্মান্তিক হচ্ছে, তার মধ্যে কাজ করতে থাকে প্রতিকারহীন প্রতিক্রিয়া৷ এটাই অস্ততিত্বের সংকট৷

 

আরও সহজে ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসের মূল কাহিনীটা সংক্ষেপে বললে এমন দাঁড়ায়-

চাঁদপাড়া গ্রামের বাইশ-তেইশ বছরের যুবক শিক্ষক আরেফ আলী, নামহীন একটা গ্রামের স্কুলে চাকরী করেন। স্বজন বলতে তার মা। দুইবেলা বাচ্চাদের পড়ানোর বিনিময়ে সে একি গ্রামের বড় বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে থাকে। দাদা সাহেব বড় বাড়ির প্রধান। কাদের দাদা সাহেবের ছোট ভাই বংশের ছোটও বলা যায়, দাদা সাহেবের সাথে তাঁর বয়সের দুরুত্ব তিরিশ বছর। ছোট বেলা থেকে সে অনেকটা উৎশৃঙ্খল, পড়াশোনায় সে একদমই মনোযোগী ছিল না। পরবর্তীতে সে হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে যায়, এতটাই নিরব যে সংসারে কারো সাথে  সে কথা বা যোগাযোগ রাখে না,  এক কথায় সে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন। বিয়ে করলেও বউয়ের সাথেও তার ততটা আপন সম্পর্ক নয়। একাকিত্বের সাথেই তার বসবাস। উপন্যাসটি দ্বি-প্রধান চরিত্র দ্বারা কেন্দ্রীভুত হয়েছে। যুবক শিক্ষক আরেফ আলী ও বড় বাড়ির ছোট ছেলে কাদের। তবে যুবক শিক্ষক আরেফ আলীই প্রধান চরিত্র আর তার ভাবনাগুলো কাদেরকে ঘিরে গঠিত। এই দুই চরিত্রের মধ্যে না বন্ধুন্ত না শত্রুতা, তবে একটা সময়ে একটু বিরুদ্ধ ভাব লক্ষ্য করা যায়। উপন্যাসের শুরু এভাবে যে, যুবক শিক্ষক ও কাদেরের সাক্ষাৎ হয় বাঁশঝাড়ে। সাক্ষাৎটা আকস্মিক, যদিও যুবক শিক্ষকের গভীর রাতে প্রকৃতি বিচরণ করার কারনটা কাদেরকে অনুসরণ করা। দাদা সাহেব এমন কি গ্রামের সবাই কাদেরকে দরবেশ ভাবে, কিন্তু যুবক শিক্ষকের বিশ্বাসটা একটু কম। কাদেরের নিশি বিচরণ তার কাছে সন্দেহের। তাই কাদের কে অনুসরণ করতে যেয়েই সে জোৎস্না বিস্তৃত রাতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, একই সাথে কাদেরকেও হারিয়ে ফেলে কিন্তু তারই সাথে একটা অপ্রস্তুত পরিবেশের সাথে তার সাথে সাক্ষাৎ হয়। আর এই অপ্রস্তুত ঘটনাটাই পুরো উপন্যাসটির আলোচনার মুল কেন্দ্র। এই ঘটনাটাই তাকে ভাবিয়ে তোলে। উলট পালট করে দেয় তার দৈনন্দিন জীবন, বিবেক আর মনুষ্যত্বের কড়া বাকবিতন্ডায় পড়তে হয় তাকে। অবশেষে মনুষ্যত্বের জয়টাই বোধ করি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সমাজের দৃষ্টিকোন থেকে সে পরাজিত।  জোৎস্না বিস্তৃত শীতের রাতে যুবক শিক্ষক বাঁশঝাড়ে একটা যুবতি নারীর অর্ধউলঙ্গ মৃতদেহ দেখে। তারপরেই তার কাদেরের সাথে সাক্ষাৎ হয়। কাদেরকে দেখেই সে ভয়ে কুকরে যায়, পাগলের মতো দৌড়াতে থাকে, উদ্ভট চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। পরের রাতে কাদের তার কাছে আসে সাহায্যের জন্য, তারা উভয়ে অর্ধ নগ্ন যুবতি নারীর মৃতদেহ নদীতে ফেলে দেয়। পর দিন সকালে যখন যুবক শিক্ষক যুবতি নারীর মৃত দেহ আবিষ্কারের কথা শুনে, সে দিকবিদ্বিক শুন্য হয়ে যায়। অদ্ভুদ চিন্তা মাথার মধ্যে ঝড় তুলতে থাকে। সে একটু ভয়ও পায়, কাদের কি তাকে হত্যাকারি ভাবে? যুবতি নারীর মৃতদেহ গুপ্ত করার জন্য সে কেন কাদের কে সাহায্য করেছিল? তার মন, শরীর অবশ করার মত চিন্তার অবসান করার জন্য সে কাদেরের সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়।

 

সার্থক সৃষ্টি যেভাবে তাদের স্রষ্টাকে ছাপিয়ে যায়, আরেফ আলীর মধ্যেও যে আমরা তেমন গুণাবলিই দেখতে পাই; আর তা হয় বলেই একজন সামান্য গৃহশিক্ষক আরেফ আলী তার রূপকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর চেয়েও অধিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়! তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মে এক অনন্য উচ্চতায় মহীয়ান হয়ে আছেন। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।

 

‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসের মূলভাবটা এরকম-

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত ‘চাঁদের অমাবস্যা’ একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। প্রেক্ষপট বলতে উপন্যাসটি কিছুটা ধর্মীয় অনুশাসন, বিত্তবানদের আধিপত্য নিয়ে লেখা। যেখানে বিত্তবানদের আধিপত্যের কাছে সত্য হার মেনে যায়। সমাজের উচ্চ সম্মানের তলায় চাপা পড়ে যায় ন্যায় বিচার। মনুষ্যত্বকে জয়ী করতে যেয়ে, ধনীদের দোষের কথা যেখানে প্রকাশ করেই বিপদে পড়ে যায় নিম্নশ্রেনীর মানুষেরা। এমনই একটা বিষয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে চাঁদের অমাবস্যা উপন্যাসে। তাছাড়া ধার্মিক গোছের মানুষের মাঝেও যে কলুষতা লুকিয়ে থাকে সেটাও প্রকাশ পায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর রচিত চাঁদের অমাবস্যা উপন্যাসটিতে। উপন্যাসে কাদের একজন দরবেশ হিসেবে পরিচিত যে সংসার থেকে পুরোটাই বিচ্ছিন্ন, তাছাড়া তার বড় ভায়েরাও অনেকটা ধার্মিক মনোভাব পোষন করেন। কিন্তু চরম নোংরা দুর্ঘটনাটা, হোক সেটা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়, কাদেরের দ্বারাই সম্পন্ন হয়।

 

 

‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কতিপয় উক্তি

সত্যই সত্যকে আকর্ষন  করে।

যে বৃক্ষটি শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে, সত্য রুপ ধারন করেছিল, মূল নেই বলে সে বৃক্ষটি নিমেষেই ধরাশায়ী হয়।

মানুষের ভাগ্য খামখেয়ালী এবং নির্মম হলেও মানুষ মায়া মমতাশূন্য নয়, অতি নিস্পৃহের নিকট ও অন্যের জীবন মুল্যহীন নয়।

মানুষের জীবনটা অতি ভঙ্গুর, একটুতেও মটকায়।

একটি কারনেই মানুষ মানুষের অন্তিম ব্যবস্থা না করে পারে না। সে কারন প্রেম, ভালবাসা।

যে ঝড়ের নাম জানা নেই, যে ঝড়কে দেখা যায় না, সে ঝড়কে চেপে রাখতে হয়।

যে কথা আকাশের সূর্য, চন্দ্রতারা, ধরণীর ফুল, লতা-পাতা-দূর্বাদল বা স্রোতস্বীনী নদী নির্বিঘ্নে বলতে পারে সে কথা বলা নিষেধ।

যে কথা হয়তো জীবন সম্মন্ধে একটি সরল কৌতূহল মাত্র, যার উৎস অজানার প্রতি মানুষের ভীতির মধ্যে সে কথা বলা নিষেধ।

আদর্শ চরিত্র শুধু রুপকথায় বিরাজ করে, বাস্তব জগতে তার অস্তিত্ব নেই।

পুরুষের ওসব দুর্বলতা থাকেই, দোষটা আসলে মেয়ে লোকটির। দুশ্চরিত্রা হলে এমন অপঘাত মৃত্যু অবধারিত।

চাঁদের অমাবস্যা ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র সম্পর্কে আরও একটু মূল্যায়ন বা কিছু কথা-

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্’র উপন্যাস-গল্প ও নাটকে ‘ভয়’, ‘চাঁদের আলো’, ‘অন্ধকার’ প্রভৃতি অনুষঙ্গ পরিবেশিত হয়েছে বারবার। ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসের কাহিনিতে চাঁদের প্রসঙ্গ, অমাবস্যার প্রতীক, মানুষের চিন্তাতীত ভাবনারাজ্য ও অর্জিত অভিজ্ঞান লেখক সাজিয়েছেন টেবিলে পাতা প্লেটের সারিতে- আপন কল্পনা ও জীবন-জিজ্ঞাসার অনুভবজ্ঞানকে অবলম্বন করে। এ গ্রন্থে প্রকৃতি, রাত, চাঁদ, অন্ধকার, আলো, কুয়াশা, নদী, বাঁশির শব্দ, বাতাসের আওয়াজ; ব্যক্তির সংশয়, সারল্য, আত্মনিমগ্নতা- এইসব বিষয় ও অনুভব সারিবদ্ধভাবে হাজির হয়েছে আমাদের সামনে। কখনো দ্বিধা, কখানো উৎসাহ, মাঝে মধ্যে বিব্রতবোধ ও মানসিক চঞ্চলতা নিয়ে পাঠে অগ্রসর হতে হতে সমাজ-পরিপ্রেক্ষিতের নানান বাঁক ও ঢালের ধাক্কায় আমরা আঁতকে উঠি।

কুয়াশাহীন শীতরাত্রি, হালকা অন্ধকার, যুবক শিক্ষকের এক যুবতীর ডেডবডি দর্শন, জোছনার প্রসন্নতা, অজানা বাঁশির সুর- সবকিছু মিলিয়ে সাদার অন্তরালে কালো, স্পষ্টতার আড়ালে অস্পষ্টতা আর সত্যকে ঢেকে দিয়ে মিথ্যার প্রভাববিস্তারের এক ধরনের ছায়া-সন্দেহ তৈরি হয় উপন্যাসের ক্যানভাসে। তারপর নানান রহস্য আর সমাজ-পরিপ্রেক্ষিতের প্রতি পর্যবেক্ষণী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখক অগ্রসরর হতে থাকেন। চাঁদের আলো থাকলে অমাবস্যা কীভাবে আসে! কিংবা অমাবস্যা রাতে তো জ্যোৎস্না থাকার কথা নয়! এইসব জিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে আমরা পারি দিতে থাকি বিশেষ এক অভিজ্ঞানের পথে দোল-খাওয়া অভিযাত্রায়!

 

 


ই-পাঠশালা’র একাডেমিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণধর্মী ক্লাস, ব্লগগুলো ভালো লাগলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না। এবং আরও ক্লাস পেতে চোখ রাখুন আমাদের ফেসবুক পেজ : ই-পাঠশালা । e-pathshala এবং ইউটিউব চ্যানেল : e-pathshala

ই-পাঠশালা’র ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার/আপনার লেখাটি ই-মেইল করতে পারো/পারেন এই ঠিকানায়:  Support@E-Pathshala.Net 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Fill out this field
Fill out this field
Please enter a valid email address.
You need to agree with the terms to proceed

Menu